১২ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ রাত ১০:৩৭
ব্রেকিংনিউজ
দ. সুনামগঞ্জে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, দুলাভাইর হাতে শ্যালক খুন দ. সুনামগঞ্জে ভোক্তা অধিকারের অভিযান, ৬ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা রাসেল বক্সের পিতার মৃত্যুতে আনছার উদ্দিনের শোক প্রকাশ দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানা পুলিশের মাস্ক বিতরণ ও সচেতনতামূলক প্রচার ৫ এপ্রিল থেকে লকডাউন: ওবায়দুল কাদের সুনামগঞ্জের কৃষি বিভাগের শুভংকরের ফাঁকি অসময়ে ধান কাঁটার তেলেসমাতি বিডি ফিজিশিয়ানের উদ্যোগে বৈজ্ঞানিক সেমিনার ও চিকিৎসা গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন হরতাল : দক্ষিণ সুনামগঞ্জে হেফাজতের পিকেটিং দক্ষিণ সুনামগঞ্জে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ দ. সুনামগঞ্জে নানা আয়োজনে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন

যাদুকাটা নদীর বুকে জেগেছে চর, সৌন্দর্য্য হারানোর শঙ্কা

মাসুদ আহমদ::
  • আপডেট : রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
  • ২০৯ বার পঠিত

খরস্রোতা যাদুকাটার যাদুময়ী স্রোত আর নেই। নেই ছলছল করে বয়ে চলা স্রোতের ধারা। চিকচিক বালির মুচকি হাসি। নেই গইন্যা, কাইল্যা, টেংরা, পুঁটি, বোয়াল, আইড়, চিংড়ি, চান্দা, চিরাইল, গোলসা, কাইক্ষা,চেলা কিংবা লবণচোরার মত সুস্বাদু মাছ।

ধূ ধূ মরুভূমির বালির বিশাল বিস্তৃত চরও নেই আগের মতো। নেই গ্যাবেল, বোল্ডার, সাইজ কিংবা গুড়া পাথর যা ছিল যাদুকাটার পানির নিচের এক সময়কার অহংকার, পাথর আহরণকারীদের মূল আকর্ষণ।

নদীর চরে আজ নেই কোন কাশবন, নেই ঘাস লতাপাতার ছড়াছড়ি। সবই হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে নদীর নাব্যতা। ভরা মৌসূমে নৌকা চললেও শুষ্ক মৌসূমে যেনো হাহাকার! হারিয়ে গেছে স্বচ্ছ জলের মোহনা। স্থির স্থবির জল গেড়েছে আস্তানা। স্থানে স্থানে কাদার চর শুকিয়ে ফাটল ধরেছে। এ যেনো যাদুকাটার বুকফাটা কান্নার করুণ আর্তনাদ!

মেঘালয়ের খাসিয়া পাহাড়ের কম বেশি আটারোটি ঝর্ণার পানি বর্ষায় নেমে আসে যাদুকাটার বুক জুড়ে, ছুটে যায় দু কুল প্লাবিত করে। নাব্যতা হারিয়ে বালি হারানোর লুকোচুরি খেলায় বেড়েছে প্রসস্থ। পার কাটার ফলে বেড়েছে এর বিস্তার, যেনো আঘাতে আঘাতে জর্জরিত, নেই বুঝি আর নিস্তার।

মেঘালয়ের সুউচ্চ পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে বারিকের টিলা আর শাহআরোফিনের মাজারের মাঝ দিয়ে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। এক সময় এ নদীর স্রোত এতই প্রবল ছিল যে, কেউ জলে নামলে সোজা সোজি তীরে উঠা প্রায় অসম্ভব ছিল। ছয় সাত হাত পানির নিচে মাঝের ছুটাছুটি স্পষ্ট দেখা যেতো। দলবেঁধে মাছের ঝাঁক ছুটে যেতো উজানের দিকে। দূর থেকে বুঝা যেতো অতি সহজেই। যা আজ শুধুই গল্প আর কল্পনা।

বর্ষায় লাউড়ের গড়, মাহরাম, ঘাগটিয়া, ঢালারপাড়, ছড়ারপাড়, রাজারগাঁও, লামাশ্রম, বিন্নাকুলি, গড়কাঠি, নোয়াগাঁও, ঘাগড়া, মোদাইরগাঁও, কালিকাপুর, কোনাঠ ছড়া, মিয়ারচর, সোহালা, মাহতাবপুর এবং আনোয়ারপুর গ্রামের মানুষের মনের আতংক ছিলো এ যাদুকাটা নদী।
১৯৮৮ সালের বন্যায় মাত্র কয়েকঘন্টার প্রলংকারী ফ্লাস ফ্লাড মাহরাম গ্রাম বিলীন করে নদীতে রুপ নেয় যা আজ মাহরাম নদী নামে সমধিক পরিচিত।

বালি, পাথর আর নদীতে বালির সাথে বর্ষায় ভেসে আসা কয়লা কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো নদীর তীরের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ। বারকি নৌকায় নিয়ে যেতো ফাজিলপুর, আনোয়ারপুর। সেখানে থাকতো বড় বড় কার্গো জাহাজ। যৎসামান্য মূল্যে বিক্রি করতে হতো সেই পাথর। সিন্ডিকেট ব্যবসার মূলোৎপাটন করে উজানে উন্মুক্ত ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টির নেপথ্যে ছিল কিছু লোকের নিরলস চেষ্টা আর অক্লান্ত পরিশ্রম। সকল বাঁধা বিপত্তি দূর করে মুক্ত স্বাধীন ব্যবসার দ্বার উন্মোচিত হলে বালি পাথর শ্রমিকদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটে। নতুন নতুন ব্যবসায়ী ব্যবসা করার সুযোগ পায়।
অবাধ ব্যবসার সুযোগ আর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে দুপারের সাধারণ মানুষের জীবনমানে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে। অনেকের জীবনে আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

কিন্তু সময় বেশিদিন স্থির থাকেনি। পার কাঁটার মহোৎসবের জ্বালায়, আর বোমা মেশিনের দিবারাত্রি দৌরাত্ম দেখে প্রশাসনের টনক নড়ে। পরিবেশবাদী নানা আন্দোলনে বন্ধ হয়ে যায় বালি পাথর উত্তোলন প্রক্রিয়া। কর্মহীন ও বেকার হয়ে পড়ে এলাকার সাধারণ মানুষ।

মেঘালয়ের পাহাড় কেটে কয়লা, চুনাপাথর উত্তোলন করে আমাদের দেশে রপ্তানি করছে ভারত। বর্ষায় এসব খনির ধুলি,বালি, মাটি পাহাড়ি ঢলের সাথে নেমে আসছে আমাদের নদ নদীতে। ভরাট করে দিচ্ছে নদীনালা খাল বিল হাওর বাওর। ভাটির জেলা, হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে আসছে ব্যাপক পরিবর্তন। টাংগুয়া, শনি, মাটিয়ান,খরচা, বলদা, লোবাসহ ছোট খাট সব হাওরেই পড়েছে এর অশুভ অশনি প্রভাব।
খরস্রোতা নদীর পরিবর্তে হয়ে যাচ্ছে স্রোতহীন নদী। যেমনটি ঘটছে যাদুকাটার বুকে। এর বিরুপ প্রভাব পড়ছে চেলা, রক্তি, বৌলাই নদীতে।

পাহাড়ের পাদদেশে বাংলাদেশের বেশ কিছু এলাকা- যেমন চানপুর, রজনীলাইন, বড়ছড়া, লাকমা, কলাগাঁও, চারাগাঁও, বাগলী, বীরেন্দ্রনগরের অনেক এলাকায় বালি মাটি পড়ে ভরাট হয়ে ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের তীর ঘেঁষা টাংগুয়ার হাওরের বিরাট অংশ যেমন- এরালিয়া কোণা, হাতির গাথা, সমসা, ভেরভেরির মতো উত্তম জলাংশ ভরাট হতে চলেছে। মাছের উৎপাদন ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে।

আগামী দু তিন দশকের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে যাদুকাটা নদী এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। খরস্রোতা যাদুকাটা শুষ্ক মৌসুমে মৃত নদীতে রুপ নিতে পারে। জীব জগত পরিবেশ প্রতিবেশের উপর পড়তে পারে এর বিরুপ প্রভাব। সংশ্লিষ্ট সকলকে এ ব্যাপারে এখনই ভাবতে হবে।নদীর বুকে জেগে ওঠা চর খননের উদ্যোগ নিতে হবে। যাদুকাটার জীবনীশক্তি ধরে রাখতে, একে বাঁচিয়ে রাখতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

লেখক
মাসুদ আহমদ
উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ধরনের আরও সংবাদ

© All rights reserved ©2020 mahasingh24.com Developed by PAPRHI.XYZ
Theme Dwonload From Ashraftech.Com
ThemesBazar-Jowfhowo